সময়ের রহস্য: এক অন্তহীন অনুসন্ধান
এক সময় পদার্থবিদরা সময়কে শুধুমাত্র একটি বিভ্রম বলে মনে করতেন। বলা হতো, সময় এমন এক উপাদান যা সব কিছুকে একসঙ্গে ঘটতে দেয় না। এমনকি অ্যালবার্ট আইনস্টাইনও বলেছিলেন, "এই জগতে অতীত এবং ভবিষ্যৎ শুধুই এক মরীচিকা, মানুষের মনোজগতের সৃষ্টি মাত্র।" কিন্তু, সত্যিই কি সময় বলতে কিছু আছে? কেন আমরা সময়ের অস্তিত্ব অনুভব করি? কেনই বা এটি আমাদের অস্তিত্বের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত? এই প্রশ্নগুলোর নির্ভুল উত্তর আজও অধরা।
সময়ের প্রকৃতি: বিজ্ঞান কি বলে?
প্রাচীনকাল থেকেই সময়ের ধারণা আমাদের জীবন, দর্শন, এবং বিজ্ঞানের অন্যতম কেন্দ্রবিন্দু। মানুষের মন সময়কে অনুভব করতে পারে, আমরা অতীতের কথা স্মরণ করি, বর্তমানকে অনুভব করি, আর ভবিষ্যৎ নিয়ে কল্পনা করি। কিন্তু বাস্তবে কি সময় বলে কিছু আছে, নাকি এটি শুধুই আমাদের মস্তিষ্কের একটি প্রক্রিয়া?
আজকের পদার্থবিদরা এই প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজতে ব্যস্ত। কেন আমাদের বিশাল মহাবিশ্ব সময়ের উপর নির্ভরশীল? কেন আমরা সময়ের প্রবাহকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারি না? কিছু বিজ্ঞানীর মতে, সময়ের প্রবাহ আসলে ধারাবাহিক নয়, বরং এটি মুহূর্তগুলোর একটি সজ্জিত বিন্যাস। অনেকটা যেন বালির কণাগুলি একটির পর একটি ঝরে পড়ে, কিন্তু একটি নিরবিচ্ছিন্ন ধারা নয়।
আরেকটি আকর্ষণীয় তত্ত্ব হলো "হাইপারটাইম" বা বহুমাত্রিক সময়। কিছু বিজ্ঞানী বিশ্বাস করেন, সময় একমাত্রিক নয় বরং দ্বিমাত্রিক হতে পারে। এর অর্থ, সময়ের আরেকটি দিক থাকতে পারে যা আমরা এখনো বুঝতে পারিনি। এই ধারণাটি, যদি সত্য হয়, তাহলে সময়ভ্রমণ বা টাইম ট্রাভেল সম্পর্কে প্রচলিত ধারণাগুলো একেবারে নতুনভাবে ব্যাখ্যা করা লাগবে।
নিউটন থেকে আইনস্টাইন: সময়ের গাণিতিক ব্যাখ্যা
আইজ্যাক নিউটনের মতে, মহাবিশ্বের ভবিষ্যৎ পুরোপুরি তার অতীত দ্বারা নির্ধারিত। তিনি সময়কে একটি ধ্রুবক এবং নিরবিচ্ছিন্ন প্রবাহ হিসেবে দেখেছিলেন, যা সব কিছুর ওপর সমানভাবে কাজ করে। ফরাসি গণিতবিদ পিয়েরে-সিমন লাপ্লাস এই ধারণাকে আরও দৃঢ় করেন। তিনি বলেন, "বর্তমান অবস্থা অতীতের ফল এবং ভবিষ্যতের কারণ।" তার মানে, যদি আমাদের অতীত সম্পর্কে সম্পূর্ণ জ্ঞান থাকে, তাহলে আমরা ভবিষ্যতও নির্ধারণ করতে পারবো।
কিন্তু, অ্যালবার্ট আইনস্টাইন এই ধারণাকে বদলে দেন। আপেক্ষিকতাবাদের তত্ত্ব অনুসারে, সময় স্থির বা সর্বজনীন নয়। এটি পরিবর্তনশীল এবং স্থান বা স্পেসের সাথে সম্পর্কিত। সময়ের প্রবাহ নির্ভর করে কিভাবে আমরা এটি পরিমাপ করি এবং আমরা কোথায় অবস্থান করছি। মহাকর্ষের উপস্থিতিতে সময় ধীরগতিতে চলে, যা ব্ল্যাক হোল বা কৃষ্ণগহ্বরের নিকটবর্তী স্থানগুলোর জন্য সত্য। এমনকি, যদি কেউ আলোর গতির কাছাকাছি ভ্রমণ করে, তবে তার জন্য সময় ধীরে চলে, যা "টাইম ডাইলেশন" বা "সময় সম্প্রসারণ" নামে পরিচিত।
লি স্মোলিন এবং নতুন দৃষ্টিভঙ্গি
কানাডার পরিমিটার ইনস্টিটিউটের বিজ্ঞানী লি স্মোলিন সময় সম্পর্কে প্রচলিত ধারণাকে চ্যালেঞ্জ করেছেন। তিনি বলেন, "যদি প্রকৃতির নিয়ম সময়ের বাইরে থাকে, তাহলে সেগুলো ব্যাখ্যাতীত। প্রকৃতির নিয়মও যদি পরিবর্তনশীল হয়, তাহলে সময়ই প্রকৃত সত্য।"
তার মতে, আইনস্টাইনের আপেক্ষিকতাবাদ যে নির্দিষ্ট সময় কাঠামোর ধারণাকে বাতিল করেছিল, সেটিকে আবার নতুনভাবে ভাবার সময় এসেছে। তিনি বিশ্বাস করেন, মহাবিশ্বের আইন ধ্রুবক নয়; বরং এটি বিকাশ লাভ করতে পারে। এটি একটি যুগান্তকারী ধারণা, কারণ এখন পর্যন্ত বিজ্ঞানীরা প্রকৃতির নিয়মকে চিরন্তন এবং অপরিবর্তনীয় বলে মনে করতেন।
স্মোলিন আরও বলেন, প্রকৃতির আইন সময়ের সাথে পরিবর্তিত হতে পারে। এমনকি কিছু বিজ্ঞানীর মতে, আমাদের মহাবিশ্ব বিভিন্ন ব্ল্যাক হোলের মাধ্যমে নতুন মহাবিশ্বের জন্ম দেয়। এটি অনেকটা ডারউইনের প্রাকৃতিক নির্বাচনের মতো, যেখানে নতুন মহাবিশ্বের বৈশিষ্ট্যগুলি পরিবর্তিত হয় এবং ক্রমান্বয়ে নতুন নিয়ম তৈরি হয়। এই ধারণা সত্য হলে, তাহলে ভবিষ্যৎ আবার নতুনভাবে রচিত হবে!
সময়ের ভবিষ্যৎ: বিজ্ঞানের পরবর্তী বিপ্লব কি আসছে?
সময় সম্পর্কে আমাদের বর্তমান ধারণাগুলো যদি পরিবর্তিত হয়, তাহলে বিজ্ঞানের বহু প্রতিষ্ঠিত তত্ত্বকেও নতুন করে ভাবতে হবে।
-
যদি সময় সত্যিই কণার মতো বিচ্ছিন্ন হয়, তাহলে কি ভবিষ্যৎ আগে থেকেই নির্ধারিত?
-
যদি সময়ের দুই বা ততোধিক মাত্রা থাকে, তাহলে কি আমরা ভবিষ্যতে সময় নিয়ন্ত্রণ করতে পারবো?
-
যদি প্রকৃতির আইন সময়ের সাথে পরিবর্তনশীল হয়, তাহলে কি আমরা একদিন সময়ের শুরু ও শেষ সম্পর্কে জানতে পারবো?
এই প্রশ্নগুলোর উত্তর এখনো অজানা। তবে, বর্তমান পদার্থবিদরা ডার্ক এনার্জি, অ্যান্টিম্যাটার এবং কোয়ান্টাম ফিজিক্সের গবেষণার মাধ্যমে এই রহস্যের সমাধান বের করার চেষ্টা করছেন।
সময়ের তীর: বর্তমান থেকে অজানা ভবিষ্যতের দিকে
সময়ের প্রকৃতি নিয়ে আমাদের জ্ঞান প্রতিনিয়ত পরিবর্তিত হচ্ছে। হয়তো একদিন আমরা সত্যিই জানতে পারবো—সময় কি শুধু আমাদের উপলব্ধির বিভ্রম, নাকি এটি মহাবিশ্বের সবচেয়ে মৌলিক বাস্তবতা?
বিজ্ঞান প্রতিনিয়ত আমাদের বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের গভীরতর সত্য উদ্ঘাটনের পথে এগিয়ে চলেছে। হয়তো একদিন আমরা সময়ের প্রকৃত স্বরূপ বুঝতে পারবো এবং হয়তো আমরা সময়কে নিয়ন্ত্রণ করতেও সক্ষম হবো।
কে বলতে পারে—আজ যা রহস্য, আগামীকাল তা বাস্তবতা হয়ে উঠবে!